মডেল থেকে কেবিন ক্রু, ৩৬০ যাত্রীর জীবন বাঁচিয়ে নিজে খেলেন গুলি

মডেল থেকে কেবিন ক্রু, ৩৬০ যাত্রীর জীবন বাঁচিয়ে নিজে খেলেন গুলি

১৯৮৬ সালে প্যান এম ফ্লাইট ৭৩ ছিনতাই হওয়া বিমানের যাত্রীদের বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন নীরজা ভানোট নামের এক ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট । মাত্র ২৩ বছর বয়সেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে বাঁচিয়েছিলেন ৩৬০ জন মানুষের প্রাণ। পরে তাকে ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।

ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট-এর চাকরি নেওয়ার সময় নীরজাকে তাঁর মা রমা ভানোত বলেছিলেন, বিমান ছিনতাই হলে পালিয়ে যেতে। উত্তরে মাকে নীরজা বলেছিলেন, ‘মরে যাব, কিন্তু পালাব না’।

পাঞ্জাবি পরিবারের মেয়ে নীরজার জন্ম চণ্ডীগড়ে, ১৯৬৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। দুই ভাই অখিল ও অনীশের সঙ্গে তাঁর বড় হওয়া অবশ্য মুম্বইয়ে। নীরজার বাবা হরীশ ভানোত ছিলেন সাংবাদিক। তাঁর কর্মসূত্রে ভানোত পরিবার চণ্ডীগড় থেকে মুম্বাই চলে এসেছিল।
চণ্ডীগড়ের সেক্রেড হার্ট স্কুলের পরে নীরজা ভর্তি হন বম্বে স্কটিশ স্কুলে। এরপর স্নাতক বম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। রাজেশ খন্নার অন্ধ ভক্ত নীরজা ষোলো বছর বয়সে প্রথম মডেলিং-এর সুযোগ পান।

১৯৮৫ সালে প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ-এ ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট পদে আবেদন করেন নীরজা। প্রশিক্ষণের জন্য মায়ামি যান। দক্ষতার জোরে ফেরেন পার্সার বা চিফ ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট হয়ে যান।

১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-তে নীরজা ছিলেন পার্সারের দায়িত্বে। বম্বে-নিউ ইয়র্ক এই উড়ানে নির্ধারিত স্টপ ছিল করাচি ও ফ্রাঙ্কফুর্ট।

করাচিতে ল্যান্ড করার কিছু ক্ষণের মধ্যে বিমান ছিনতাই করে আবু নিদাল জঙ্গি গোষ্ঠীর চার সশস্ত্র দুষ্কৃতী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বিমানটিকে সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। সেখানে থাকা প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের উদ্ধার করা।

বিমানে ছিলেন ৩৯৪ জন পূর্ণবয়স্ক যাত্রী এবং ৯ জন শিশু। বিমান ছিনতাইকারীদের কবলে চলে গেছে, ককপিটে এমন খবর শোনান নীরজা নিজেই। বিমান তখন টারম্যাকে দাঁড়িয়ে, ককপিট থেকে ওভারহেড হ্যাচে পালিয়ে যান পাইলট, কো পাইলট এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার।

পালানোর সুযোগ ছিল নীরজার সামনেও। তিনি জানতেন কোন গোপন পথে গেলে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারবেন তিনি। কিন্তু যাননি। বরং ঠান্ডা মাথায় কথা বলে গিয়েছেন ছিনতাইকারীদের সঙ্গে। তিনি জানতেন ছিনতাইকারীদের মূল নিশানা মার্কিন যাত্রীরা।
নীরজার কাছে যাত্রীদের পাসপোর্ট চায় জঙ্গিরা। কিছু মার্কিন যাত্রীদের পাসপোর্ট নীরজা লুকিয়ে ফেলেন আসনের নীচে। বাকিগুলো ফেলে দেন ডাস্টবিনে, জঞ্জালের মধ্যে। যাতে জঙ্গিরা বুঝতে না পারে বিমানের কোন যাত্রীরা মার্কিন।

উপস্থিত বুদ্ধির জোরে নীরজা যাত্রীদের আপদকালীন দরজা দিয়ে বের করতে থাকেন। তবে তার আগেই এক ইন্দো মার্কিন যাত্রীকে গুলি করে দেহ টারম্যাকে ফেলে দেয় দুষ্কৃতীরা।

টানা ১৭ ঘণ্টা ধরে জঙ্গিদের সঙ্গে চলে নীরজার স্নায়ুযুদ্ধ। এর মধ্যেই বেশির ভাগ যাত্রীদের নিরাপদে বিমান থেকে বের করতে সক্ষম হন তিনি। কিন্তু ফ্লাইট পার্সার নিজে পারেননি বের হতে।

ততক্ষণে নিজেদের কাছে থাকা বিস্ফোরক ব্যবহার করতে শুরু করেছে জঙ্গিরা। অন্ধকার বিমান থেকে তিনজন শিশুকে ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে বের করার সময় জঙ্গিদের কাছে ধরা পড়ে যান নীরজা। তাঁকে পরপর গুলিতে বিদ্ধ করে বিমান ছিনতাইকারীরা। বাইশ বছর পূর্তির জন্মদিনের দুদিন আগে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন বাবা মায়ের ‘লাডো’। কিন্তু একটা বুলেটও ওই তিন শিশুর গায়ে লাগতে দেননি তিনি।

শুধু যাত্রীদের প্রাণ রক্ষাই নয়। নীরজার জন্য ছিনতাইকারীরা বিমানটিকে নিয়ে করাচি ছেড়ে উড়ে পারেনি। পরে তাদের গ্রেফতার করে পাকিস্তানি আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে অবশ্য সেই শাস্তি বদলে যায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে।

বীরাঙ্গনা নীরজাকে মরণোত্তর ‘ভারতচক্র’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। পাশাপাশি, পাকিস্তান-সহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে। ২০০৪ সালে তাঁর নামে ভারতে প্রকাশিত হয় ডাকটিকিট। সূত্র-আনন্দবাজার