করোনা ভাইরাস: লেখাটি মন দিয়ে পড়তে বললেন ডা. আব্দুন নূর তুষার

১. দেশে সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে কারা আছেন?

যারা স্বাস্থ্য সেবা দেন তারা আছেন। ডাক্তার, নার্স সহ সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কর্মরত ব্যাক্তিরা, এমনকি পরিচ্ছন্নতা কর্মীও। আছেন যারা সরাসরি মানুষের বা মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যের সংস্পর্শে আসেন।
যেমন: বিউটি পার্লার, ফিজিওথেরাপি, কেয়ারগিভার , কাঁচা বাজারের কর্মী, কসাই, ধোপা, হোটেল কর্মচারী, টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক, সংবাদ কর্মী…

২. যদি হাসপাতালের কর্মীরা আক্রান্ত হয় তাহলে কি হবে?

করোনা রোগী চিকিৎসা পাবেন না। সাধারন রোগীরাও চিকিৎসা পাবেন না। করোনা ছাড়াও তো রোগ আছে এবং সেসব রোগীরাও মারা যান। তারা আরো বেশী সংখ্যায় মারা যাবেন।

৩. ডাক্তার আক্রান্ত হলে আর কি হবে?

তিনি নিজে বহু চিকিৎসাপ্রার্থী সাধারণ রোগীকে আক্রান্ত করবেন। কারন রোগের লক্ষন প্রকাশ হতে ১৪ দিন লাগে। ভাইরাস তার আগেই ছড়াতে থাকে। রোগীরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৪. আইসিইউ বেড রেডি। ১৫০ টা আইসিইউ রেডি। বলেছেন সেব্রিনা ফ্লোরা আপা।

কোন লাভ নাই। করোনা রোগী যে আইসিইউতে উঠবে সেখানে সাধারণ রোগী রাখা যাবে না। তাহলে হার্ট অ্যাটাক থেকে শুরু করে তাবৎ রোগ, যে কারনে আইসিইউ লাগে, সেসব রোগী কোথায় যাবে? এরা মরতে শুরু করবে। ডেঙ্গু কিন্তু কাজ শুরু করে দিয়েছে।

৫. মাত্র অল্প কয়েকজনের রোগ হয়েছে। ভয় নাই।

ভয় ছিল না যদি এই জাতি কারণ ছাড়া ওভার ব্রিজেরে উপরে, আন্ডারপাসের ভেতরে, রেলগাড়ীর প্ল্যাটফর্মে, ইউ লুপের ওপরে , হাতিরঝিলের রাস্তায় দাড়িয়ে না থাকতো। দাড়িয়ে দাড়িয়ে শসা কাটা থেকে ঘৃতকুমারীর শরবত বানানো দেখা যদি এদের অভ্যাস না হতো। করোনা ছড়ানোর সময়ে তারা ছুটি মনে করে সমুদ্র সৈকতে না যেতো আর আতশবাজি দেখার জন্য রাস্তা ভরে না জমায়েত করতো। লাখ লাখ লোক এক হয়ে দোয়া করে এই জাতি যেখানে কাবা ঘরেও প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত করেছে সৌদি সরকার। আসলেই ভয় ছিল না। কিন্তু এখন ভয় পাবার কারণ তৈরী হয়েছে। এখন একসাথে কয়েক লক্ষ লোক আক্রান্ত হবে কারণ, এই শসা কাটা দেখা লোকজন একেক জন কয়েক’শ লোককে আক্রান্ত করবে। তারা আরো কয়েক’শ। ইটালি ফেরতরা তো আছেই। আপনারা একটা ফ্লাইট নিয়ে ভাবছেন। সেটা তো শেষ ফ্লাইট । এর আগে যারা এসেছিল? সারা দুনিয়া থেকে যারা এসেছে? এখন ভয় পাবার কারণ আছে।

৬. আরো ভয় পাবার কারন আছে।

সরকার ডাক্তারদের জন্য যথেষ্ট প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করেন নাই। দেশে সরকারী ডাক্তারদের জন্য প্রতিদিন ডিসপোজেবল মাস্ক, পিপিই-পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট দরকার। দরকার বেসরকারিদের জন্যও। অথচ সেই সরবরাহ অপ্রতুল। ল্যাবরেটরি নাই যেখানে লাখ লাখ মানুষের রক্ত পরীক্ষা সম্ভব। কিট নাই। বায়োহ্যাজার্ডাস স্পেসিমেন হ্যান্ডল করার প্রশিক্ষনও নাই।

৭. সরকার কিট আনতে চাইছে এবং থানা লেভেলেও পাঠাতে চাইছে। এটা আরো ভয়ংকর।

এই কাজ করা হলে সেখানে কেবল স্পেসিমেন হ্যান্ডল করতে না পারার কারনে রোগ ছড়াবে এবং সেখানে ল্যাবও নাই।

৮. দ্রুত অবস্থার নিয়ন্ত্রন যদি না হয়…

দিনমজুর ও প্রান্তিক শ্রেনীর মানুষ কাজ হারাবে। হোটেল রিসোর্ট খাবার দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। পাঠাও উবার বন্ধ হয়ে যাবে। ফেরিওয়ালারা ক্রেতা হারাবেন।হকাররা রাস্তার পাশে ব্যবসা করতে না পেরে সর্বস্বান্ত হবেন। এয়ারলাইন , বাস , ট্রেন, লঞ্চ যাত্রী পাবে না। বিয়ে শাদী বন্ধ হয়ে যাবে। পার্লার বন্ধ হবে। বিক্রি কমে যাবে সোনা রুপা শাড়ী জামা গয়নার। যারা লোন নিয়ে ব্যবসা করছিলেন, তারা কিস্তী শোধ করতে পারবেন না। বাড়ীভাড়া দিতে পারবেন না। ফ্ল্যাটের কিস্তী দেয়ার আগে ক্রেতা মরে গেলে রিয়াল এস্টেটও বন্ধ হবে। অর্থনীতি মেল্টডাউন করবে।

৯. করনীয় কি?

ক. অবিলম্বে স্বাস্থ্যখাতে দৃষ্টি দিন । আন্ত মন্ত্রনালয় টাস্কফোর্স করে ও সিটিজেনস অ্যাকশন ফোরাম করে, তাদের মধ্যে কাজের সমন্বয় করেন। রাজনীতি না, সমাজকর্মী হিসেবে নিজেকে ভাবেন ও সেভাবে কাজ করেন।

খ. সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

গ. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন। বেদরকারী মিটিং মিছিল সব বন্ধ করেন। বিশেষ করে খোলা জায়গায় লোক জমায়েত।

ঘ. গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে পিপিই সরবরাহ করেন। কেনার ব্যবস্থাও করে দেন।

ঙ. গুজব ছড়ায় যখন প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষ বিশ্বাস হারায়। তাই যারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন এমন ব্যক্তিদের দিয়ে প্রচারণামূলক ভিডিও/ অডিও , পডকাস্ট তৈরী করুন।

চ. প্রতিদিন বেহুদা এসএমএস না পাঠিয়ে এখন মানুষের করণীয় কি , সে বিষয়ে এসএমএস পাঠান।

ছ. সকল উপজেলায় র‌্যাপিড রেসপন্স টিম সংগঠন করেন।

জ. দ্রুত প্রশিক্ষন দিন। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রস্তুত করেন।

আর যদি সম্ভব হয়:

নির্দিষ্ট তারিখ থেকে ২১ দিনের জন্য পুরো বাংলাদেশ লকডাউন করে দেন। সব বন্ধ। রাস্তায় মানুষ থাকবে না। অনুমতিবিহীণ কোন কিছু থাকবে না। লকডাউন চলাকালে কি কি কাজ কিভাবে হবে সেটা পরে বিস্তারিত লিখবো।

মানুষ বাঁচাতে হবে।
অর্থনীতি বাঁচাতে হবে।

মানুষ করোনাতে যতো মরবে তার চেয়ে বেশী মরবে নিস্ব হয়ে। যদি না আমরা এখনি ব্যবস্থা না নেই।

জনতা মরে গেলে কার নেতা হবেন? কে শুনবে বক্তৃতা, কে দেখবে আপনাদের বিপিএল ক্রিকেট আর সালমান খানের নৃত্য?

রাজনীতিবিদ না, সেলেব্রিটি না, মোটিভেশনাল স্পিকার না, সমাজকর্মী হিসেবে নিজেকে ভাবেন ও সেভাবে কাজ করেন।

এখনো সময় আছে। থ্রেশোল্ড বা অভিঘাত বিন্দু পার হয়ে গেলে আর কোন কিছুতেই কাজ হবে না।

 

নিউজ সোর্স: আজ সারাবেলা

 

Comments are closed.